মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কাল থেকে, কার্ড থেকেও চাল পাচ্ছেন না ৭১২ জেলে!
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৯
স্বপ্নভূমি ডেস্ক :
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে রাজবাড়ীর পদ্মানদীতে আগামীকাল ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান। আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ সময় পদ্মানদীতে সব ধরনের মাছ ধরা, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের মুখে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ের হাজারো জেলে পরিবার। নদীতে নামা বন্ধ হলেও সংসার চালানোর বিকল্প পথ না থাকায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁদের।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কার্ডধারী জেলে রয়েছেন ৬ হাজার ৩০৪ জন। অথচ চলতি মৌসুমে ইলিশ জেলেদের জন্য খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ) চাল বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৫ হাজার ৫৯২ জনের জন্য। ফলে খোদ সরকারি হিসাব অনুযায়ীই কার্ডধারী ইলিশ জেলেদের মধ্যে ৭১২ জন চাল সহায়তা পাচ্ছেন না।
এর পাশাপাশি পদ্মাপাড়ের বাস্তবচিত্র আরও করুণ। দীর্ঘ ৫ থেকে ৮ বছর ধরে পেশাদার হিসেবে নদীতে মাছ ধরা শত শত জেলেদের এখনও কোনো সরকারি ‘জেলে কার্ড’ মেলেনি। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বছরের পর বছর মাছ ধরেও প্রকৃত জেলেরা কার্ড পান না; অথচ অ-মৎস্যজীবীদের অনেকেই প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় জেলে কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন।
সরেজমিনে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট, মিজানপুর এবং গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ও ধাওয়াপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞার ঠিক আগের দিনগুলোতে নৌকা মেরামত ও জালে আলকাতরা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। তবে কাজের ফাঁকেও তাঁদের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
বরাট এলাকার জেলে জমির হালদার আক্ষেপ করে বলেন, "প্রায় ৫-৬ বছর ধরে পদ্মায় মাছ ধরছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত জেলে কার্ড হয়নি। পরিবারে ৫-৭ জন মানুষ। এই ২২ দিন ঘরে ভাত জোগাব কীভাবে? পেট তো মানবে না, বাধ্য হয়ে লুকিয়ে হলেও নদীতে নামতে হবে।"
দৌলতদিয়ার শুকচান হালদার ও ধাওয়াপাড়ার ইদ্রিস ব্যাপারীর অভিজ্ঞতাও একই। আবার মিজানপুরের জেলে ইয়াকুব আলীর কার্ড থাকলেও তিনি জানান, নিবন্ধিত হিসেবে সরকার থেকে যে ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে এত বড় পরিবার এক সপ্তাহ চালানোও কঠিন। প্রায় তিন দশক ধরে মাছ ধরা সোহেল হালদার জানান, পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিলে জেলেদের ঘরে আটকে রাখা কঠিন হবে।
বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক জানান, মা ইলিশের প্রজনন মৌসুম রক্ষায় এই ২২ দিন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই সময়ে ইলিশকে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিলে পরবর্তীতে পদ্মায় উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
প্রকৃত জেলেদের কার্ড না পাওয়া এবং চাল না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "জেলেদের তালিকা প্রতি বছরই হালনাগাদ করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে অ-জেলেদের বাদ দেওয়া হবে এবং নতুনদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অভিযান সফল করতে আমরা সকলের সহায়তা কামনা করছি।"
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মা ইলিশ সংরক্ষণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পাশাপাশি অবিলম্বে প্রকৃত জেলেদের ডাটাবেজ সঠিক করা এবং খাদ্য সহায়তার পরিধি ও বিকল্প কাজের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জীবন-জীবিকার তাড়নায় অভিযান ব্যাহত হতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :