আনোয়ার হোসেন, মনিরামপুর (যশোর) :
জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মেলেনি আশ্বাস। অবশেষে মানুষের ভোগান্তি দূর করতে নিজের ঘাম ঝরানো উপার্জনে কপোতাক্ষ নদের ওপর ৩০০ ফুট দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী জিয়াউর রহমান। যশোরের মনিরামপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলাকে সংযুক্ত করা এই সেতুটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক আশীর্বাদের নাম। আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এটি চলাচলের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
মনিরামপুরের ডুমুরখালী বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাটে নির্মিত এই কাঠ ও বাঁশের সেতুটি মনিরামপুর ও ঝিকরগাছার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে। আগে এই দুই পাড়ের মানুষকে যাতায়াতের জন্য ছোট নৌকার ওপর নির্ভর করতে হতো। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্য পারাপার ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়রা জানান, এই সেতুর ফলে যাতায়াতের দূরত্ব প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার কমেছে। এখন সাইকেল, মোটরসাইকেল তো বটেই, ভ্যান ও ইজিবাইকও সহজেই যাতায়াত করতে পারবে।

অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা জিয়াউর রহমান দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় কর্মরত। তিনি বলেন, “ছুটিতে বাড়ি এসে মানুষের কষ্ট দেখে একাধিকবার সাবেক সমবায় প্রতিমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি, কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। শেষে সিদ্ধান্ত নিই নিজের টাকাতেই সেতু করব।”
প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩০০ ফুট লম্বা ও ৬ ফুট চওড়া এই সেতুটি তৈরিতে ৪০০টি বাঁশ এবং ২৬০ সেফটি কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ দিন ধরে একদল শ্রমিক নিরলস পরিশ্রম করে এটি তৈরি করেছেন। জিয়াউর রহমান ঘোষণা দিয়েছেন, এই সেতু পারাপারে কোনো টাকা নেওয়া হবে না এবং ভবিষ্যতে মেরামতের খরচও তিনি নিজেই বহন করবেন।
জিয়াউরের সমাজসেবা শুধু এই সেতুতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ডুমুরখালী বাজারকে সিসি ক্যামেরার আওতায় এনেছেন, মাদ্রাসায় ভবন নির্মাণ ও শিক্ষার্থীদের পোশাক বিতরণ করেছেন। এমনকি নিজ এলাকায় ১৬ শতক জমির ওপর একটি পাঁচতলা হাসপাতাল নির্মাণের কাজও শুরু করেছেন, যেখানে নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা পাবেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় বাসিন্দা কওসার আলী ও রেখা বেগম বলেন, “আগে মাইলের পর মাইল ঘুরে বা নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হতো। জিয়াউর যা করে দেখিয়েছেন, তা আমাদের কল্পনার বাইরে। তিনি প্রমাণ করেছেন মানুষের জন্য কাজ করতে বড় পদের প্রয়োজন হয় না, শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট।”
হরিহরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “জিয়াউর মহৎ কাজ করেছেন। এখানে একটি স্থায়ী কংক্রিট সেতু হওয়া জরুরি। আমি আগামী উপজেলা পরিষদের সভায় বিষয়টি উত্থাপন করব।”
আপনার মতামত লিখুন :