দক্ষিণবঙ্গের প্রাণপুরুষ তরিকুল ইসলামের ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩১
নিজস্ব প্রতিবেদক:
আজ ৪ নভেম্বর। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নের রূপকার, বরেণ্য রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তরিকুল ইসলামের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৮ সালের এই দিনে ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে শুধু বিএনপির রাজনীতিতেই নয়, যশোরসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল। আট বছর পেরিয়ে গেলেও যশোরের মাটি ও মানুষের স্মৃতিতে তিনি আজও এক অমলিন ও প্রাতঃস্মরণীয় নাম।
আন্দোলন ও সংগ্রামের এক বর্ণাঢ্য জীবন
১৯৪৬ সালের ১৬ নভেম্বর যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন তরিকুল ইসলাম। তাঁর পিতা আলহাজ আব্দুল আজিজ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং মাতা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। শিক্ষাজীবন থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে যশোর এমএম কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৩ সালে সর্বক্ষেত্রে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যুগ্ম-আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৬৬ ও ১৯৬৮ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে রাজবন্দি হিসেবে দীর্ঘদিন কারাভোগ করেন। ১৯৭০ সালে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দিয়ে তিনি ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ ও ১৯৭৮ সালে সফলভাবে যশোর পৌরসভার যথাক্রমে ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালনায় অনন্য দক্ষতার পরিচয় দেন।
জাতীয় রাজনীতিতে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা
পরবর্তী সময়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন তরিকুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির ৭৬ সদস্যের অন্যতম এবং যশোর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক ছিলেন। আমৃত্যু তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
উন্নয়ন ও জনকল্যাণে অনন্য অবদান
১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তরিকুল ইসলাম সমাজকল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ, খাদ্য, তথ্য এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি নিজের জন্মভূমি যশোর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। স্পষ্টভাষী, দৃঢ়চেতা ও জনদরদি রাজনীতিক হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেন। রাজনীতি তাঁর কাছে কেবল পদ-পদবি ছিল না; ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক নিরন্তর প্রয়াস।
বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক ঐতিহ্য
রাজনীতির পাশাপাশি গণমাধ্যমের জগতেও তাঁর অবদান রয়েছে; তিনি পাঠকপ্রিয় দৈনিক লোকসমাজ পত্রিকার প্রকাশক ছিলেন। তাঁর পারিবারিক জীবনেও শিক্ষা ও রাজনীতির নিবিড় সংযোগ রয়েছে। সহধর্মিণী অধ্যাপক নার্গিস বেগম যশোরের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। তাঁর বড় ছেলে শান্তনু ইসলাম সুমিত দৈনিক লোকসমাজ-এর প্রকাশক এবং ছোট ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আজকের এই দিনে দক্ষিণবঙ্গের অবিসংবাদিত এই নেতার প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
আপনার মতামত লিখুন :