• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Techogram

যশোরে ইজিবাইক-অবৈধ রিকশাই কি যানজটে মূল কারণ;


FavIcon
সাইফুল্লাহ খালিদ
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১৩:৪৮
ছবির ক্যাপশন: ad728

স্টাফ রিপোর্টার:
খেঁজুর গুড়, ফুল-পাখি আর নকশি কাঁথার জন্য বিখ্যাত যশোর শহর এখন যানজটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ১৪.৭২ বর্গ কিলোমিটারের এই জেলা শহরে প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। প্রতিদিন সকাল হলেই সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, আদালত, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসা হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয় শহরটি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তীব্র যানজটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে যশোরের জনজীবন। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ রিকশা ও ইজিবাইকই কি এই যানজটের একমাত্র মূল কারণ, নাকি প্রশাসনিক নজরদারি ও সুপরিকল্পনার অভাবও এর পেছনে দায়ী?

সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা থেকে রেলগেট, নিউ মার্কেট, মনিহার ও বিমান অফিস মোড় পর্যন্ত সড়কে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১১টা ৩০ মিনিট এবং বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত যানজট চরম আকার ধারণ করে। বিকেল ৫টার পর দড়াটানা থেকে হাসপাতাল মোড়ের মাত্র দুই মিনিটের পথ পার হতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লাগছে।

শিক্ষার্থী তন্ময় কুমার রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শহরে চলার মতো পরিবেশ নেই। যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে পৌঁছানো যায় না। বাধ্য হয়ে হেঁটে ব্রিজ পার হতে হয়, এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে।

যশোর পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, পৌর এলাকায় মোট ২ হাজার ৯৯৩টি পায়ে-চালিত রিকশা, ৪ হাজার ৪৬৮টি ইজিবাইক ও ৩০০টি ভ্যান গাড়ির লাইসেন্স দেওয়া আছে। মোটরচালিত রিকশার কোনো আইনগত অনুমোদন নেই। তবে অভিযোগ রয়েছে, পায়ে-চালিত রিকশার অনুমোদনের আড়ালে প্রতিদিন হাজার হাজার মোটরচালিত রিকশা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরজুড়ে।

প্রশাসনের নাকের ডগায় শহরের বিভিন্ন গ্যারেজে প্রতিদিন গড়ে অর্ধ-শতাধিক অবৈধ মোটরচালিত রিকশা তৈরি হচ্ছে। প্রভাবশালী চক্র প্রতিদিন ২৫০ টাকা চুক্তিতে যে কারো হাতে (বয়স ও ড্রাইভিং দক্ষতা বিচার না করেই) রিকশার চাবি তুলে দিচ্ছে। ফলে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালকরা সড়কের মাঝেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করছেন।

এছাড়া গ্রামীণ এলাকা থেকেও হাজার হাজার অবৈধ ইজিবাইক মূল শহরে ঢুকে পড়ছে। বৈধ লাইসেন্সধারী ইজিবাইক চালক রমজান আলী বলেন, আমরা ১৪ হাজার টাকা দিয়ে পৌরসভার লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি, অথচ গ্রাম থেকে প্রতিদিন অবৈধ ইজিবাইক এসে ১০-২০ টাকার বিনিময়ে শহরে ঢুকে যানজট বাড়াচ্ছে। প্রশাসন কোনো স্থায়ী সমাধান করছে না।

কেবল রিকশা ও ইজিবাইক নয়, শহরের যানজটের পেছনে আরও বেশ কিছু জটিল কারণ চিহ্নিত করেছেন স্থানীয়রা। যার মধ্যে রয়েছে, ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় দোকানপাট। কোথাও কোথাও ব্যবসায়ীরা টাইলস বসিয়ে সরকারি ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছেন। ফুটপাত না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করছে। শহরে প্রায় ৩০টি স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী স্ট্যান্ড, যেখানে প্রতিদিন ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার যানবাহন অবস্থান করে। শহরে কোনো ট্র্যাফিক সিগন্যাল লাইট, সাইন-মার্ক বা জেব্রা-ক্রসিং নেই। সড়ক পারাপারে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।

যানজট নিরসন ও শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে গত সোমবার (২৪ আগস্ট) যশোর পৌরসভা ও ট্রাফিক পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু অবৈধ রিকশা ও ইজিবাইক আটক করে।

এর প্রতিবাদে এবং আটককৃত যানবাহন বিনাশর্তে ফেরতসহ বৈধ লাইসেন্স প্রদানের দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোরের সামনে মানববন্ধন করে ‘রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন (৯৩৯)’। মানববন্ধনে সংগঠনের সভাপতি খায়রুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বলেন, যানবাহন আটকে দেওয়ায় শ্রমিক পরিবারগুলো আজ চরম অর্থসংকটে পড়েছে। পৌরসভার সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও তারা স্থায়ী সমাধান না করে চালকদের জীবিকায় আঘাত হানছে।

অভিযানের বিষয়ে যশোর পৌরসভার প্রকৌশলী কামাল হোসেন জানান, অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে পৌরসভার যৌথ অভিযান চলমান রয়েছে। সতর্ক করার পরও যারা ট্রাফিক আইন অমান্য করছে, কেবল তাদের যানবাহনই আটক করা হচ্ছে। জনস্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

যশোরের সুশীল সমাজের মতে, শুধু রিকশা বা ইজিবাইক আটক করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও স্থায়ী যানজট নিরসন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। যার মধ্যে অন্যতম অবৈধ গ্যারেজ ও যানবাহন তৈরি বন্ধ করা। গ্রামের ইজিবাইক যেন মূল শহরে ঢুকতে না পারে সে জন্য প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসানো। ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ দেওয়া। জেব্রা-ক্রসিং, ডিজিটাল সিগন্যাল চালু করা এবং নির্দিষ্ট পার্কিং ও স্ট্যান্ড নির্ধারণ করা।

সচেতন নাগরিক সমাজ যশোরের সাবেক সভাপতি ইকবল কবির শাহিন বলেন, ইজিবাইক চললে শহরে যানজট হবে কেন? মূলত আমাদের রাস্তাঘাট ও ব্যবস্থাপনার সংকট রয়েছে। আমাদের শহরের ছোট রাস্তাঘাট প্রশস্থ করলে যানজট কম হবে। থানা এবং জেলা প্রশাসকের সামনে ফুটপাত দখল হচ্ছে তারা কি করছে। এখানে কাদের স্বার্থ রয়েছে সেটা দেখা দরকার। হাঁটার মত পরিবেশ নাই শহরে । পারাপারে একমাত্র রাস্তা দড়াটানার ব্রীজ। বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা করা দরকার। মূলত শহর নিয়ে পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। শ্রমজীবী মানুষের রুজি কেড়ে নেওয়া যাবে না। সব কিছু মিলিয়ে আমাদের শহরকে আমাদের সাজাতে হবে।