• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
Techogram

মহান মে দিবস শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রত্যয়ে নতুন অঙ্গীকার


FavIcon
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬, ১৪:১৭
ছবির ক্যাপশন: ad728

সম্পাদকীয় :
আজ মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৮৮৬ সালের হে-মার্কেট ঘটনাতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকরা দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর ১ মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশে দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন প্রত্যয় জাগানোর দিন হিসেবেও বিবেচিত। কারণ, একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার শ্রমজীবী মানুষ। কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও সেবা প্রতিটি খাতেই শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে লাখো শ্রমিকের শ্রমেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের শক্ত ভিত।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়,এই বিশাল অবদানের বিপরীতে শ্রমিকরা কতটা পাচ্ছেন তাদের ন্যায্য অধিকার? ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, এবং সামাজিক নিরাপত্তা এই মৌলিক বিষয়গুলো এখনও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়নি। যদিও ২০০৬ সালের শ্রম আইনসহ বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, বাস্তব প্রয়োগে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক এখনও আইনি সুরক্ষার বাইরে।

মে দিবস এলে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা নতুন করে আলোচনায় আসে। তৈরি পোশাক খাতে কিছু উন্নতি হলেও নির্মাণ, গৃহকর্ম ও পরিবহন খাতে শ্রমিকদের জীবন এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিশ্চিত।

এদিকে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিও শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অটোমেশন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির প্রসারের ফলে অনেকের কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার শ্রমিক কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা প্রকল্প ইত্যাদি। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা বাড়াতে প্রয়োজন আরও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সমন্বিত প্রয়াস।

শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হয় না, যা পরিবর্তন করা জরুরি। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার শ্রমশক্তির উপরই।

বিশ্বায়নের যুগে শ্রমিক অধিকার এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে শ্রমনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্প খাতে।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শ্রমিকদের জীবন আরও চ্যালেঞ্জপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই এই সময়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, একটি জরুরি প্রয়োজন।

মে দিবস আমাদের অতীতের সংগ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, পাশাপাশি ভবিষ্যতের পথও দেখায়। ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই হোক এই দিনের মূল অঙ্গীকার।

মহান মে দিবসে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রত্যাশা রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হবে। তাহলেই শিকাগোর সেই আত্মত্যাগ সত্যিকার অর্থে সার্থক হবে, এবং প্রতিষ্ঠিত হবে একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।

রুদ্র ফারাবী
গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট