যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থামেনি ইসরায়েলি তাণ্ডব, গাজায় মানবিক বিপর্যয় চরমে
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৫, ১১:২১
স্বপ্নভূমি ডেস্ক : খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছে ফিলিস্তিনিরা, কাদা-মাটির ঘরে চলছে শীত মোকাবিলার লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি অবরোধের কারণে সেখানকার মানুষের দুর্ভোগ বিন্দুমাত্র কমেনি। ক্ষুধা, তীব্র ঠান্ডা, ভয়াবহ চিকিৎসা সংকট এবং অব্যাহত হামলার আতঙ্কে গাজা এখন এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের মুখে। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলের হামলা থেমে না যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
যুদ্ধবিরতিতে নিহত ২৩৬, ধ্বংসস্তূপে মিলছে আরও মরদেহ । ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও এক মাসে অন্তত ২৩৬ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায়ও তিনজনের মৃত্যু এবং ধসে পড়া ভবন থেকে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এছাড়াও, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের টানা দুই বছরের বোমাবর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার আরও প্রায় ৫০০ ফিলিস্তিনির মরদেহ ধসে যাওয়া বাড়িঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, রেডক্রসের মাধ্যমে তিনজন ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ ফেরত আনা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ইসরায়েলি বন্দির মরদেহের বিনিময়ে ইসরায়েলকে ১৫ জন করে মৃত ফিলিস্তিনি বন্দির মরদেহ ফেরত দিতে হবে।
ইসরায়েলি অবরোধের ফলে গাজার হাসপাতালগুলো চরম সংকটে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি গুরুতর অসুস্থ রোগী এখনো গাজায় আটকা পড়ে আছেন, যাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিসর প্রায় ৪ হাজার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও তুরস্ক সহ অন্যান্য দেশ মিলে প্রায় ৩ হাজার ফিলিস্তিনি আহতকে চিকিৎসার জন্য গ্রহণ করলেও, এখনো ৩ হাজার ৮০০ শিশুসহ হাজারো মানুষ বিদেশে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষমাণ।
শীত ঘনিয়ে আসায় গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা এখন টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন। ইসরায়েলের নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে তাঁবু বা সিমেন্টের ঘর তৈরি করা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। তাই অনেকেই ধ্বংসস্তূপের ইট আর কাদা দিয়ে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
গাজা সিটির বাসিন্দা খালেদ আল-দাহদুহ আল জাজিরাকে বলেন, “তাঁবু নেই, সিমেন্ট নেই— তাই ধ্বংসস্তূপের ইট আর কাদা দিয়ে অস্থায়ী ঘর বানিয়েছি। অন্তত ঠান্ডা, পোকা আর বৃষ্টি থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়।” জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) গাজা প্রতিনিধি আলেসান্দ্রো ম্রাকিচের মতে, নির্মাণসামগ্রীর অভাবে প্রাচীন পদ্ধতিতে আশ্রয় গড়া ছাড়া ফিলিস্তিনিদের আর কোনো উপায় নেই।
সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, তাপমাত্রা কমতে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। ক্ষুধা, ঠান্ডা আর অনিশ্চয়তার মুখে গাজার মানুষ এখনও মৃত্যুভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সম্প্রতি হামাসের বিরুদ্ধে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি ত্রাণবাহী ট্রাক লুটের অভিযোগ করেছে। একটি ড্রোন ফুটেজের বরাত দিয়ে বলা হয়, 'হামাস সদস্যরা' মানবিক সহায়তা দখল করে নিয়েছে।
তবে গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে 'সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো প্রচারণা' বলে অভিহিত করেছে। তারা উল্টো ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করে বলেছে, “ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা সরবরাহে বাধা দিচ্ছে, যাতে ক্ষুধা তৈরি করে গাজায় মানবিক বিপর্যয় ঘটানো যায়।”
আপনার মতামত লিখুন :