কমপ্লিট শাটডাউন ও ইতিহাসের দীর্ঘতম ব্ল্যাকআউটের ২ বছর পূরণ
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৯
স্বপ্নভূমি ডেস্ক :
আজ ১৮ জুলাই। দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল নজিরবিহীন সংঘর্ষ ও সহিংসতা। একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাণ্ডব ও হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল-গুলি, অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে দিনটি রূপ নিয়েছিল এক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। আর দিনের শেষভাগে সারা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে দেশকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।
১৮ জুলাই সকাল থেকেই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ সফল করতে রাজপথে নেমে আসেন সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের রূপ নেয় রাজধানীর উত্তরা এলাকা। সকাল ১১টার পর থেকেই পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পুলিশ নির্বিচারে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়লে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আন্দোলনকারীরা।
গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে পুলিশের গাড়ি দিয়ে আন্দোলনকারীদের চাপা দেওয়ার নৃশংস দৃশ্য। সন্ধ্যার মধ্যেই কেবল উত্তরা থেকেই ৮ জনের মৃত্যুর খবর আসে। যার মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আন্দোলনকারীদের মাঝে ‘পানি লাগবে, পানি?’ বলে তৃষ্ণা মেটানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। তার এই আত্মত্যাগ পরবর্তীতে আন্দোলনের প্রধানতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
এতদিন আন্দোলন মূলত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ১৮ জুলাই ব্র্যাক ও ইস্ট ওয়েস্টসহ একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রগতি সরণি এলাকায় সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন।
এ ছাড়া মহাখালী, বনানী, মিরপুর, ধানমন্ডি ও যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার প্রতিটি কোণায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানী সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর-১০-এ পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয় এবং মেট্রোরেল লাইনে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় ৪টি স্টেশন বন্ধ করা হয়। ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ। আর যাত্রাবাড়ীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক মেহেদি হাসান।
এক নজরে ১৮ জুলাইয়ের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি:
- নিহত: সরকারি সূত্রে ৩১ জন, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিবেদনে অন্তত ২৭ জন (যার মধ্যে সাংবাদিকও ছিলেন)।
- আহত: ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ।
- বিস্তৃতি: দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় একযোগে সংঘর্ষ ও ভাঙচুর।
- আকাশপথে হামলা: ইতিহাসের প্রথমবার কোটা আন্দোলনের ওপর হেলিকপ্টার থেকে টিয়ারশেল ও গুলি বর্ষণ।ট’
দিনভর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রামপুরায় অবস্থিত বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় এই মাধ্যমের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
রাত ৯টার পর সরকার সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় (মোবাইল ইন্টারনেট ১৭ জুলাই রাত থেকেই বন্ধ ছিল)। পরবর্তী সময়ে ৫ দিন ব্রডব্যান্ড এবং ৮ দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার এই ঘটনাটি ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তৎকালীন সরকার মহাখালীর খাজা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডকে ইন্টারনেটের কারণ হিসেবে দেখালেও পরবর্তীতে আইএসপিএবি জানায়—তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, বিটিআরসি এবং এনটিএমসির নির্দেশেই মূলত ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল।
সরকারের আলোচনার প্রস্তাব ও সমন্বয়কদের ঐতিহাসিক প্রত্যাখ্যান
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেদিনই সুর নরম করতে বাধ্য হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। ওবায়দুল কাদের ঘোষণা করেন, সরকার ৮০% মেধা ও ২০% কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করবে।
তবে সরকারের এই প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ সাফ জানিয়ে দেন, “গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।” আরেক সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেন, “শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না।”
অন্যদিকে, তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ একে জামায়াত-বিএনপির সহিংসতা বলে দাবি করেন এবং ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করে।
১৮ জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি ছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের অন্যতম অনুঘটক। মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ এবং ফারহান ফাইয়াজের আত্মত্যাগ আজ জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি মুগ্ধসহ ৮৩৪ জন শহীদের পরিবারের বিচারের অপেক্ষা। তবে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের টেলিযোগাযোগ আইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নতুন আইনে চাইলেই যেন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ বা নাগরিকদের ওপর নজরদারি করতে না পারে, তার জন্য বিটিআরসির জবাবদিহিতা ও আইনি সীমাবদ্ধতা কঠোর করা হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :