যশোরে বোরো ধানের বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের: বৃষ্টি ও শ্রমিক সংকটে চাষি
শাহরিয়ার সীমান্ত
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৫ মে ২০২৬, ০৭:৩৭
স্টাফ রিপোর্টার ঃ
যশোরে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠে মাঠে সোনালী ধানের দোল দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলেও কৃষকের মনে এক বিন্দু শান্তি নেই। একদিকে কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির আতঙ্ক, অন্যদিকে তীব্র শ্রমিক সংকট ও বাজারে ধানের নিম্নমুখী দাম—সব মিলিয়ে ঘাম ঝরানো ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম সংশয়ে পড়েছেন জেলার চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর যশোরে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ হেক্টর। তবে অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৫০ হেক্টর বেশি জমিতে ধান চাষ হয়েছে।
মাঠে ধান পাকতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। বিশেষ করে কেশবপুর উপজেলায় দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। কৃষি দপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, কেশবপুরে ৮৫ হেক্টর বোরো ধানসহ পাট, সবজি ও আম বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ধান কাটার ভরা মৌসুমে মাঠ পর্যায়ে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। কেশবপুরের কৃষক হারুন আর রশিদ আক্ষেপ করে বলেন, "একসাথে সবার ধান পাকায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিয়েও লোক মিলছে না। এই বাড়তি খরচ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে।"
বাজারে ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। বর্তমানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষক সোলাইমান হোসেন জানান, এক মণ ধান বিক্রি করে দুজন শ্রমিকের মজুরিও দেওয়া যাচ্ছে না। সার, বীজ ও সেচসহ এক বিঘা জমিতে ধান ফলাতে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বছর শেষে হিসাব করলে লাভের খাতা শূন্যই থেকে যায়।
এদিকে সরকার চলতি মৌসুমে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে এখনো সরকারি সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। আইয়ুব হোসেন নামে এক চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার ভালো দাম দিলেও সাধারণ কৃষকরা সেখানে ধান বিক্রি করতে পারে না। আমাদের কম দামেই খোলা বাজারে ধান বিক্রি করতে হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, "জেলায় বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু ক্ষতি হলেও আগামী দুই দিন আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অধিকাংশ ধান ঘরে উঠে যাবে। ইতিমধ্যে জেলায় ৪৫ শতাংশ ও সদরে ২০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
শ্রমিক সংকট প্রসঙ্গে তিনি জানান, সংকট কাটাতে কৃষকরা এখন কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করছেন। তবে অনেক কৃষক খড়ের আশায় মেশিন ব্যবহার না করে ধান কাটতে দেরি করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিপণন পরিস্থিতি নিয়ে জানতে জেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তৃণমূলের চাষিদের দাবি, আবহাওয়া আরও খারাপ হওয়ার আগেই সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু করা এবং বাজারে নায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।
আপনার মতামত লিখুন :