আজ বিপ্লবী নেতা বিজয় রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী
Swapnobhumi
নিউজ প্রকাশের তারিখ : ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ৬:৫২
বাঘারপাড়া প্রতিনিধি :
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী নেতা ও শিক্ষানুরাগী বিজয় চন্দ্র রায়ের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তৎকালীন কংগ্রেসের বৃহত্তর যশোর জেলার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়; যশোর সরকারি এমএম কলেজের প্রতিষ্ঠালগ্নে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দাতা সদস্য, সরকারি হোমিও কলেজের জমিদাতা ও খাজুরা সরকারি শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন মহাবিদ্যালয় স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮২ সালের ৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন এই বিপ্লবী নেতা। এ উপলক্ষে আজ বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলা ১৩০৬ সনে বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের বন্দবিলা গ্রামে বিজয় রায়ের জন্ম। তার বাবা তৎকালীন জমিদার ষষ্ঠীবর রায় ও মা মোক্ষমা সুন্দরী দেবী। ১৪ বছর বয়সে লীলাবতীকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান কল্যাণী রানী রায়। নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিজয় রায় বিএ পাশ করেন। তিনি মনে প্রাণে অনুভব করতেন শিক্ষা ব্যতীত কোন জাতির উন্নতি করতে পারেনা। এই অনুভূতিতে ১৯৩১ সালে বিজয় রায় ও তার ভাই বসন্ত রায় বন্দবিলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ৭০ বিঘা জমি দান করে ১৯৬১ সালে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়টি এখন বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে জহুরপুর ইউনিয়নের বেতালপাড়া সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বাজার প্রতিষ্ঠায় জমি দান করেন বিজয় রায়।
ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সার্বক্ষণিক রাজনীতিতে যোগ দেন। সে সময়ও বন্দবিলা ইউনিয়ন কৃষি প্রধান অঞ্চল ছিল। এখানকার কৃষকের ব্রিটিশদের খাজনা না দিতে বিজয় রায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদেরকে অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয় করেন তিনি। নিজ হাতে তাঁতে বুনে কাপড় পড়তেন বিজয় রায় এবং ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের জন্য আন্দোলন শুরু করেন।
এসব কারণে ব্রিটিশ সরকারের সাথে তার তুমুল দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যে কারণে ব্রিটিশ সৈন্যরা বন্দবিলা গ্রামের হরিদাস পাঙ্গগুলির বাড়িতে ক্যাম্প তৈরি করে। ফলে ব্রিটিশদের সাথে এ অঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে বড়খুদড়া গ্রামে এক ব্রিটিশ সৈন্য মারা যায়। এরপর থেকেই এলাকায় ব্যাপক দমন, পীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় ব্রিটিশ সরকার এবং বিজয় রায়কে গ্রেফতার করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর কেন্দ্রীয় জেলখানায় অন্তরীন থাকেন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি মিললেও আরো কয়েকবার গ্রেফতার হন।
আন্দোলন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি দেখতে ১৯৩৭ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের কিংবদন্তী নেতা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বন্দবিলায় আসেন। বিজয় রায়ের দুরদর্শিতার কথা ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত আলোচনা হয়।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হলে বিজয় রায় পূর্ব পাকিস্থানে কংগ্রেসের দলীয় কার্যক্রম এগিয়ে নিতে শুরু করেন। যে কারণে কংগ্রেসের বৃহত্তর যশোর জেলার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। কংগ্রেস নেতা নড়াইলের সৈয়দ নওশের আলী, যশোরের কেশবপুর উপজেলার পশুপতি বোস ও রবি সরকার, বাঘারপাড়া উপজেলার মির্জাপুর গ্রামের কাজী আব্দুল গণি এবং কৃষক নেতা যাদবপুর গ্রামের মাস্টার নুরুল ইসলাম বিজয় রায়ের সান্নিধ্যে রাজনীতি করতেন।
পাকিস্থান আমলে বিজয় রায় বন্দবিলা বোর্ড অফিস রাখার আন্দোলন করে সফল হন। তখন যশোর শহরের আরএন রোডে কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয় ছিল। যা বিজয় রায়ের সম্পত্তি। ১৯৭৭ সালে সরকার এটির দখল নেয় এবং সেই সম্পত্তিতে হোমিও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ স্বাধীনের পর বিজয় রায় দেশের উন্নয়নে পুনর্বাসন কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন।
রুপকথার মত এক দু:সাহসিক সংগ্রামী জীবন শেষে ১৯৮২ সালের ৭ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন এই বিপ্লবী নেতা। সাহসী, মেধাবী, দানশীল ও পরোপকারী বিজয় রায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নীতিগত আদর্শে আবিচল ছিলেন। এলাকার সর্বস্তরের মানুষ আজও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। মানবিক পৃথিবী বিনির্মাণের লড়াইয়ে বিজয় রায় আজীবন আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।
উল্লেখ্য, তৎকালীন হরিদাস গাঙ্গুলি পদবি পরিবর্তিত হয়ে ‘রায় সাহেব’ হন। বিজয় রায়ের সেই বাড়িটি এখনো বন্দবিলা গ্রামে কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জরাজীর্ণ বাড়িটি ২০২২ সালে সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন পাঠাগারে রুপ দেয় বাঘারপাড়া উপজেলা প্রশাসন। নিভৃত পল্লীতে প্রতিষ্ঠানটি আজও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো আলোর উৎস হয়ে। শতবছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধারণ করে স্বমহিমায় জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্ব।
আপনার মতামত লিখুন :