প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 13, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 13 June 2026, 04:09 ইং
ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত দখলে মার্কিন সেনাবাহিনীর গোপন পরিকল্পনা ভন্ডুল করলেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সামরিক উপায়ে জোরপূর্বক দখল করার একটি গোপন পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে পেন্টাগনের সেই সামরিক পরিকল্পনা আর আলোর মুখ দেখেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (পেন্টাগন) একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
সিএনএন জানায়, গত ১৯ মে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা শহরে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকোম) সদর দপ্তরে বেশ কয়েক জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা একটি অত্যন্ত গোপন বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্ষদ ‘জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’র চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন উপস্থিত ছিলেন। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য জেনারেল ড্যান কেইন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটের শরিক রাষ্ট্রগুলোর সেনাপ্রধানদের পূর্বনির্ধারিত একটি বৈঠকের সূচিও কাটছাঁট করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দ করার লক্ষ্যে একটি বিশেষ স্থল অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন সামরিক কর্মকর্তারা। কীভাবে সেই অভিযান পরিচালনা করা হবে, তার একটি খসড়া পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে জেনারেল ড্যান কেইন ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও অভিযানের খসড়া রূপরেখা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তা বাস্তবায়নের অনুমতি চান।
তবে জেনারেল ড্যান কেইনের এই প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা বাতিল করে দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন সেনাপ্রধানকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, সামরিক উপায়ে ইউরেনিয়ামের দখল নিতে গেলে ইরানের তরফ থেকে মারাত্মক ও গুরুতর প্রতিক্রিয়া আসবে। এর ফলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে এবং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি এক গভীর বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে। তাছাড়া, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন নাগরিক ও সেনা হতাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ট্রাম্প।
ইরানের পরমাণু প্রকল্পের পাশাপাশি দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দীর্ঘদিন ধরেই তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনার প্রধান কারণ। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি’ (আইএইএ)-এর তথ্য অনুসারে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই বিশুদ্ধতার মান ৯০ শতাংশে উন্নীত করা গেলেই তা দিয়ে একের পর এক পরমাণু বোমা তৈরি করতে পারবে তেহরান।
২০২৫ সালের জুন মাসে আইএইএ এই তথ্য প্রকাশ করার পর, ইরানের ইউরেনিয়াম হস্তগত করতে ওই মাসেই দেশটিতে এক যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র। ১২ দিনব্যাপী সেই অভিযানে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা সম্ভব হলেও, ইউরেনিয়ামের মূল মজুতের কোনো সন্ধান পায়নি ওয়াশিংটন-তেল আবিব জোট।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে দফায় দফায় সংলাপ হলেও কোনো সমঝোতা ছাড়াই তা শেষ হয়। এর পরপরই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। প্রায় ৪০ দিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমানে সেই যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের মাধ্যমে গোপনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পরমাণু বোমার কাঁচামাল তৈরির উদ্দেশ্যে পরমাণু প্রকল্পের আড়ালে ইরান ইউরেনিয়াম বিশুদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, ইরান এই অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে আসছে যে, তাদের পরমাণু কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
বর্তমানে ইরানের এই ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ঠিক কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে— তা এখনও এক বড় রহস্য। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান, কোনো সামরিক সংঘাতের পথ না মাড়িয়ে ইরান যেন কূটনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে তাদের এই ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ স্বপ্নভূমি নিউজ