প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 6, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 06 June 2026, 11:42 ইং
পরিবেশগত অপরাধ বাড়ছে, বিচার মিলছে না: সংস্কারের অপেক্ষায় পরিবেশ আদালত

রুদ্র ফারাবী
দেশে বায়ুদূষণ, নদীদূষণ, অবৈধ ইটভাটা, জলাশয় ভরাট, পাহাড় কাটা এবং বন উজাড়ের মতো পরিবেশগত অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেলেও এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে গঠিত বিশেষায়িত পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। আইনজীবী, পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এর বিভিন্ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিচারপ্রাপ্তির জটিল প্রক্রিয়া এর অন্যতম কারণ।
পরিবেশ সংরক্ষণে আইনগত কাঠামো থাকলেও বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কিংবা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর জন্য আদালতের দ্বার সহজে উন্মুক্ত নয়। বর্তমান আইন অনুযায়ী, কেউ সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারেন না। অভিযোগ প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিতে হয়। এরপর অধিদপ্তরের তদন্ত ও প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আদালত মামলা গ্রহণ করতে পারে। ফলে বিচারপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবস্থার কারণে অনেক ভুক্তভোগী আইনি প্রতিকার চাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মামলাই আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না।
পরিবেশ আইন বিষয়ে কাজ করা আইনজীবীরা বলছেন, পরিবেশগত অপরাধের প্রকৃতি অন্যান্য অপরাধের তুলনায় ভিন্ন। এর প্রভাব শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সমাজ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর ক্ষতির শিকার হয়। তাই পরিবেশ আদালতে সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জনস্বার্থে মামলা দায়েরের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
পরিবেশবিদদের মতে, দেশে পরিবেশগত অপরাধের সংখ্যা ও বিস্তৃতি বিবেচনায় পরিবেশ আদালতের সংখ্যাও অপ্রতুল। অনেক জেলায় এখনো পৃথক পরিবেশ আদালতের কার্যক্রম নেই বা নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও ধীর হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, পরিবেশ ধ্বংসের মাধ্যমে অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিপুল আর্থিক সুবিধা অর্জন করছে। কিন্তু বিদ্যমান আইনে নির্ধারিত জরিমানা ও শাস্তির পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে সেই আর্থিক লাভের তুলনায় খুবই কম। ফলে শাস্তির ভয় অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। তারা পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য আরও কঠোর অর্থদণ্ড, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
পরিবেশ সুরক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেন, বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ করা, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা জোরদার এবং আইন সংস্কারের মাধ্যমে পরিবেশগত অপরাধ দমনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় পরিবেশ ধ্বংসের বর্তমান প্রবণতা দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
পরিবেশবিদদের ভাষায়, “পরিবেশের ক্ষতি কোনো একক ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি পুরো জাতির ক্ষতি।” তাই পরিবেশ আদালতকে আরও জনবান্ধব, কার্যকর ও সহজলভ্য করে তোলার দাবি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ স্বপ্নভূমি নিউজ