প্রিন্ট এর তারিখঃ May 24, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 24 May 2026, 11:21 ইং

রুদ্র ফারাবীঃ
অগ্নিবীণার অমর কবি, সাম্য ও মানবমুক্তির চিরবিদ্রোহী কণ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মরণ
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন বিদ্রোহের কবি, মানবতার কবি এবং সাম্যের অগ্রদূত। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন প্রেম ও সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি উঠে এসেছে শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃপ্ত প্রতিবাদ। আজ তাঁর ১২৭তম জন্মদিনে আমরা স্মরণ করি সেই মহান কবিকে, যিনি তাঁর কলমের মাধ্যমে মানুষকে মুক্তি, সাম্য ও মানবাধিকারের পথে আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সংগ্রামী ও প্রতিভাবান। দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সেই তাঁকে জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়তে হয়। কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, কখনো লেটো গানের দলে যোগ দিয়ে গান ও নাটক রচনা করেছেন। জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যকে শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী করে তোলে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাজীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও লেখায় গভীর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধ, শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদের ভয়াবহতা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। ফলে তাঁর সাহিত্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদী ও বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ছিল এক নবজাগরণের সূচনা। তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বিদ্রোহী” প্রকাশের পর তিনি “বিদ্রোহী কবি” নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই কবিতায় তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর আরেকটি বিখ্যাত কবিতা “সাম্যবাদী”তে তিনি ঘোষণা করেন—
“গাহি সাম্যের গান —
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”
এই চেতনা ছিল তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের মূল ভিত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ কিংবা জাতপাতের বিভেদ থাকা উচিত নয়। তাঁর কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ পরিচয়। তাই তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির কথা বলেছেন বারবার। তাঁর গান, কবিতা ও প্রবন্ধে মানবমুক্তির যে আহ্বান পাওয়া যায়, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
নজরুল শুধু কবিতাই লেখেননি; তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, গীতিকার ও সুরকার। বাংলা গানে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি প্রায় চার হাজার গান রচনা করেন, যা আজ “নজরুলসংগীত” নামে পরিচিত। ইসলামী গান, প্রেমের গান, দেশাত্মবোধক গান ও শ্যামাসংগীতে তিনি এক অনন্য ধারা সৃষ্টি করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে অগ্নিবীণা, সর্বহারা, দোলনচাঁপা, বিষের বাঁশি, ব্যথার দান প্রভৃতি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ধূমকেতু পত্রিকা সম্পাদনা করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁর লেখনী এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কারারুদ্ধ করে। কারাগারেও তিনি থেমে যাননি; বরং সেখানে বসেই রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা “রাজবন্দীর জবানবন্দী”। এতে তিনি স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন।
জীবনের শেষদিকে নজরুল দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং দীর্ঘদিন বাকশক্তিহীন অবস্থায় কাটান। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।
আজ তাঁর ১২৭তম জন্মদিনে আমরা শুধু একজন কবিকে স্মরণ করি না; আমরা স্মরণ করি এক সাহসী চেতনার নামকে। সাম্য, মানবতা ও মুক্তির যে বাণী তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন, তা যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে। বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনের সংগ্রামে নজরুল আজও এক উজ্জ্বল প্রেরণা।