প্রিন্ট এর তারিখঃ Feb 28, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 28 February 2026, 10:08 ইং

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিদায়ী ২০২৫ সালে সারাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার মোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। যার মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। সামাজিক সংগঠন ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’-এর এক সমীক্ষায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশের ১৬৫টি জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তুলে ধরে সংগঠনটি।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, মোট আত্মহননকারী ৪০৩ জনের মধ্যে ১৯০ জনই স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থী, যা মোট ঘটনার ৪৭.৪০ শতাংশ। এছাড়া কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন (২২.৮%), বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন (১৯.১০%) এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে ৪৪ জন (১০.৭২%) শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৈশোরের আবেগীয় অস্থিরতা ও একাডেমিক চাপ সামলাতে না পেরে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৬১.৮ শতাংশই নারী (২৪৯ জন) এবং ৩৮.২ শতাংশ পুরুষ (১৫৪ জন)। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষায় পুরুষদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ও কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য করছে।
তদন্তে দেখা গেছে, ২৭.৭৯ শতাংশ আত্মহত্যার পেছনে দায়ী ছিল ‘হতাশা’ এবং ২৩.৩২ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী ছিল ‘অভিমান’। এছাড়া:
- একাডেমিক চাপ: ৭২ জন (যার ৭১ শতাংশই নারী)।
- প্রেমঘটিত কারণ: ৫৩ জন।
- পারিবারিক টানাপড়েন: ৩২ জন।
- যৌন নির্যাতন: ১৪ জন।
সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েও এক নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
বিভাগ অনুযায়ী ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (৬৩ জন) ও বরিশাল (৫৭ জন)। বয়সভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সর্বোচ্চ (৬৬.৫০%)। এমনকি ১ থেকে ১২ বছর বয়সী ৪৪ জন শিশুর আত্মহত্যার ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গভীর উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ৭৭ জনের মধ্যে ৪৪ জনই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার পেছনে ৪৭.০৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই মূল কারণ ছিল তীব্র হতাশা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেমঘটিত ও মানসিক অস্থিরতা বড় ভূমিকা রেখেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, পরিবারে যোগাযোগের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। আঁচল ফাউন্ডেশন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি জরুরি প্রস্তাব দিয়েছে:
১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং।
২. পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ।
৩. সামাজিক ট্যাবুর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারণা।
৪. শিক্ষক ও সহপাঠীদের জন্য বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে আগামী প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।