প্রিন্ট এর তারিখঃ Jan 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 15 January 2026, 14:07 ইং

স্টাফ রিপোর্টার, যশোর:
ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চলতি মৌসুমে বোরো ধান আবাদ করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন কৃষকরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার ভবদহ এলাকার সুজাতপুরসহ ছয়টি গ্রামে মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে অন্তত দেড় হাজার বিঘা ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে সদ্য প্রস্তুত করা বোরো ধানের বীজতলা। এতে প্রায় পাঁচ শতাধিক কৃষক পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগে পড়েছেন।
বুধবার অতিরিক্ত পানির চাপে সুজাতপুর পল্লীমঙ্গল মৎস্য ঘেরের দক্ষিণ পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ নিশ্চিত করতে ঘের পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রায় এক মাস ধরে একটানা ৪০টিরও বেশি সেচযন্ত্র দিয়ে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত পানি সেচের ফলে ঘেরের ভেতরে পানির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলাতে না পেরে বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়।
এই ঘটনায় মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর, হাটগাছা ও কুলটিয়া এবং অভয়নগর উপজেলার মশিয়াহাটী, বেদভিটা ও বলারাবাদ গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে গেছে। এসব গ্রামে বসবাসরত প্রায় তিন হাজার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের বসতবাড়ির আঙিনা, বাগানবাড়ি, সবজি ক্ষেত, পুকুর ও মৎস্য ঘের ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে কিংবা তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, বোরো মৌসুমের শুরুতেই তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক প্লাবনে সেই বীজতলা সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরি করা সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক কৃষক আশঙ্কা করছেন, এবছর তারা বোরো আবাদই করতে পারবেন না।
কুলটিয়া গ্রামের মৎস্য ঘের মালিক স্বপন রায় জানান, তার তিন শতাধিক বিঘা জমির মৎস্য ঘেরের বেড়িবাঁধ ভেঙে মাছ পানিতে ভেসে গেছে। তিনি বলেন,“এটি আমাদের জন্য চরম আর্থিক বিপর্যয়। বছরের শুরুতেই সব শেষ হয়ে গেল।” একই গ্রামের আরেক ঘের মালিক তপন রায় বলেন, তার ঘেরের উত্তর পাশের বেড়িবাঁধ ভেঙে প্রায় ৮শ’ বিঘা ঘেরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে, যা কোনোভাবেই পূরণ করার মতো নয়।
এ বিষয়ে পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি অভয়নগর শাখার আইন বিষয়ক সম্পাদক অনিল বিশ্বাস বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের দুর্দশার বিষয়টি ইতোমধ্যে মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, দ্রুত ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কার না করা হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ও আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।
এদিকে বৃহস্পতিবার যশোর-৫ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ও মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি ও ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা ঘুরে দেখেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে দ্রুত সরকারি সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি তোলার আশ্বাস দেন।
পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সন্তোস স্বর, কুলটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. হামিদুল ইসলাম, এলাকার প্রবীণ নেতা পরিতোষ বিশ্বাস, নিপুন বিশ্বাসসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
ভবদহ অঞ্চলের মানুষ আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে এবছর পুরো বোরো মৌসুমই ব্যাহত হবে। এতে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এলাকাবাসীর দাবি, জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ না দিলে ভবদহ অঞ্চলের সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।