প্রিন্ট এর তারিখঃ Jan 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 05 January 2026, 11:34 ইং

স্বপ্নভূমি ডেস্ক:
দেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ক্রমেই শ্লথ হয়ে পড়ছে, যার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে আটকে থাকা বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নভেম্বর শেষে নেমে এসেছে ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশে। একই সময়ে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদের চাপ ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছেন— যা শিল্প সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নভেম্বরেও বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী, বিনিয়োগ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
টানা ছয় মাস ধরে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে আটকে আছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬.৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধারা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধির এই ধীরগতি নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগে স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণের চাহিদাও কমেছে, যা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে নতুন বিনিয়োগ না হলে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বাড়ে না। বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, নতুন শিল্প ও সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগ খুবই সীমিত।
ব্যাংকাররাও একই মত প্রকাশ করে জানান, উচ্চ সুদহার, দুর্বল চাহিদা এবং নীতিগত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘‘নির্বাচনের পর ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক হলে বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও বাড়বে বলে আশা করা যায়।’’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির দায় নিষ্পত্তি ১৬ শতাংশের বেশি কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বিনিয়োগ স্থবিরতার একটি বড় সূচক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেক কারখানা বন্ধ বা আংশিক সক্ষমতায় চলায় ব্যাংক ঋণের চাহিদা আরও কমেছে। কিছু শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনও তৈরি হচ্ছে না।
ব্যাংক সুদের উচ্চ ব্যবধান বাড়াচ্ছে ব্যবসার খরচ, চাপে উদ্যোক্তারা
এদিকে ব্যাংক ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঋণ গ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগে। উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কমছে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ। পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংকও।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে আমানত গ্রহণ করলেও ঋণ বিতরণ করেছে গড়ে ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ সুদে। এতে গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তবে বাস্তবে কিছু ব্যাংকে এই ব্যবধান ৮ থেকে ১০ শতাংশেরও বেশি, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সুদহার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুযোগে কয়েকটি ব্যাংক স্প্রেড অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়েছে। এতে ঋণের খরচ বেড়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়ছেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যেখানে ঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ৩ শতাংশের নিচে, সেখানে বাংলাদেশের এই উচ্চ স্প্রেড প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
গত ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়। সভায় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর স্প্রেড বেড়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সম্মিলিত উদ্যোগে তা সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনার তাগিদ দেন। যদিও এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনও নির্দেশনা না দিয়ে নৈতিক চাপের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার পথেই হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকারদের একটি অংশ বলছেন, কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত সরে গিয়ে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে থাকা ব্যাংকে জমা হচ্ছে। ফলে এসব ব্যাংক কম সুদ দিয়েও প্রচুর আমানত পাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ সেই অনুপাতে কমানো হচ্ছে না। অপরদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশের বেশি সুদ পাচ্ছে। এসব কারণে স্প্রেড আরও বেড়েছে।
উচ্চ স্প্রেড ব্যাংকের মুনাফা বাড়ালেও অর্থনীতির জন্য তা ইতিবাচক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ঋণের খরচ বেশি হলে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘শুধু স্প্রেড দেখেই ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা বিচার করা ঠিক নয়। গ্রস সুদের হিসাবে স্প্রেড বেশি মনে হলেও নিট মুনাফা, খেলাপি ঋণ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত স্প্রেড ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সহায়ক নয়।’’
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদসীমা কার্যকর ছিল। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ‘স্মার্ট’ পদ্ধতি চালু হয় এবং একই বছরের নভেম্বরে স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে সুদহার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা না এলে ঋণের উচ্চ খরচ তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে থাকবে। তাই বিনিয়োগ ও উৎপাদন সচল রাখতে স্প্রেড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা উদ্বেগ
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‘অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেউ ঝুঁকি নিয়ে নতুন বিনিয়োগ করতে চায় না। বিনিয়োগের আগে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ব্যবসায়ীরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।’’
জ্বালানি সংকট ও চড়া সুদের চাপ
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও বিনিয়োগে অনীহার বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোকসান বাড়ছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ কার্যত অযৌক্তিক হয়ে পড়েছে।
সরকারি সিকিউরিটিজে ঝুঁকছে ব্যাংক
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো এখন ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এসব নিরাপদ খাতে প্রায় ১১ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক ব্যাংকের আয়ের বড় অংশ এখন সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের ব্যালান্স শিটের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন ঘুরে না দাঁড়ালে অর্থনীতির জন্য এটি ভালো বার্তা নয়।