প্রিন্ট এর তারিখঃ Jan 15, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ 03 January 2026, 11:19 ইং

শাহারুল ইসলাম ফারদিন:
দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমসকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বিতর্ক ও আলোচনা শেষে বড় ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনসহ কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের ১৭ জন কমিশনারকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) এনবিআরের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের দ্বিতীয় সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি হয়। এই রদবদলকে কেন্দ্র করে বেনাপোলসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদায়ী বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের মহাপরিচালক পদে বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. ফাইজুর রহমান। তিনি এর আগে রাজশাহী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
জানা গেছে, বেনাপোল কাস্টমসে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ করতে চার মাস আগে খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর কাস্টমস হাউস থেকে বহিরাগত অপসারণ, কিছু ক্ষেত্রে ঘুষ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মতো কয়েকটি উদ্যোগ চোখে পড়ে। তবে সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলেই অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের।
বরং দায়িত্ব পালনকালে নানা ঘটনায় তিনি নিজেই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসেন। গত ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা শামিমা আক্তারের কাছ থেকে ঘুষের টাকা উদ্ধার করা হয় এবং তার এক সহযোগীকে আটক করে দুদক। অভিযোগ ওঠে, কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনের যোগসাজশে ওই সময় অভিযুক্ত রাজস্ব কর্মকর্তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় দুদক। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন বিক্ষোভের মুখে ওই রাজস্ব কর্মকর্তাকে আবার দুদকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এছাড়া ভারত থেকে কাগজপত্রবিহীন পণ্যবোঝাই ট্রাক আটক হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের রক্ষায় সহায়তার অভিযোগ ওঠে কমিশনারের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনাকে ঘিরে বেনাপোল কাস্টমস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, কমিশনারের নিজের বিরুদ্ধে কিংবা তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও তিনি সেগুলো কখনোই গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেননি। বরং ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এসব প্রতিবেদন উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। আরও অভিযোগ আছে, গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেছিলেন এমন ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টদের পরবর্তী সময়ে শোকজ করা হয়। এতে কাস্টমস হাউসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই নিরুৎসাহিত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে আরও অভিযোগ রয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের একাধিক রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফাইল আটকে রেখে জোরপূর্বক ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কমিশনারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ যাচাই বা অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা না নিয়ে এসব প্রতিবেদন উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং কাস্টমস হাউসে ফাইলকেন্দ্রিক অনিয়ম আরও উৎসাহ পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা অন্যান্য বদলির মধ্যে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঢাকার কমিশনার আবুল বাসার মো. শফিকুর রহমানকে চট্টগ্রাম আইসিডি কাস্টম হাউসে, যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার শেখ আবু ফয়সল মো. মুরাদকে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঢাকার মহাপরিচালক মো. আবদুল হাকিমকে যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরের কমিশনার এ কে এম নূরুল হুদা আজাদকে গাজীপুর ভ্যাট কমিশনারেটে, ঢাকা কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসানকে নারায়ণগঞ্জ ভ্যাট কমিশনারেটে, রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার অরুণ কুমার বিশ্বাসকে বরিশাল ভ্যাট কমিশনারেটে, খুলনা ভ্যাট কমিশনারেটের (আপিল) কমিশনার এস এম সোহেল রহমানকে ময়মনসিংহ ভ্যাট কমিশনারেটে এবং ঢাকা-১ ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেটের কমিশনার শামীম আরা বেগমকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঢাকার কমিশনার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
নতুন পদায়নের মধ্যে রয়েছেন শামীমা আক্তারকে ঢাকা-১ ভ্যাট (আপিল) কমিশনারেটে, মু. রইচ উদ্দিন খানকে ঢাকা ইকোনমিক জোন কমিশনারেটে, মোহাম্মদ ছালাউদ্দিন রিপনকে ঢাকা শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তরে, মুহা. মাহবুবুর রহমানকে রাজশাহী ভ্যাট কমিশনারেটে, মো. গিয়াস কামালকে ঢাকা কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্টে, মোহাম্মদ সফিউর রহমানকে রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটে, মো. মুশফিকুর রহমানকে সাতক্ষীরার ভোমরা কাস্টমস হাউসে এবং মানস কুমার বর্মনকে খুলনা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই একযোগে বদলিকে কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং অনিয়ম রোধে এনবিআরের কঠোর বার্তা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নতুন কমিশনারের নেতৃত্বে বেনাপোল কাস্টমসে বাস্তবে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেদিকেই এখন সবার নজর।